অদৃশ্য ঘাতক শেষ পর্ব
লেখক: ওয়াজাদ আহমেদ
এসআর (SR) এর চাকরিটা আকাশের জন্য কেবল জীবিকা নয়, বরং এক অদ্ভুত দণ্ড। প্রতিদিন রোদে পুড়ে দোকানে দোকানে গিয়ে যখন সে পণ্যের অর্ডার নেয়, তখন তার কানে সেই ড্রয়িং রুমের হাসাহাসি আর আত্মীয়দের বাঁকা কথাগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে।
তার ব্যাগে থাকা ইনভয়েস প্যাডের ভাঁজে সে মাঝে মাঝে পেন্সিল দিয়ে ছোট ছোট স্কেচ আঁকে হয়তো কোনো জ্যামিতিক নকশা কিংবা কোনো বিধ্বস্ত মানুষের মুখ।
এক বিকেলে বৃষ্টির কারণে আকাশ একটা পুরনো লাইব্রেরির বারান্দায় আশ্রয় নিল। ভেতর থেকে আসা পুরনো কাগজের গন্ধটা তাকে মুহূর্তেই সেই ১০ বছর আগের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ঠিক তখনই পাশের দেয়ালে সাঁটানো একটা পোস্টারে তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা রয়েছে "জাতীয় চিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা।"
আকাশের হাতটা অজান্তেই পকেটে থাকা কলমটার দিকে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল মানিক সাহেবের সেই শান্ত গলা, “যা করার আজকে করে নে।” আজ ১০ বছর পর সেই আদেশটা যেন তার মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বইয়ে দিল।
বাসায় ফিরতেই দেখল ড্রয়িং রুমে আবার জটলা। এবার আলোচনার বিষয় আকাশের বিয়ে।
পাত্রীপক্ষ বেশ অবস্থাপন্ন।
মানিক সাহেব গর্বিত মুখে বলছেন, “আমার ছেলে তো ইঞ্জিনিয়ার, এখন নামকরা কোম্পানিতে বড় পোস্টে আছে। ক্যারিয়ার খুব উজ্জ্বল!”
আকাশ তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাসল। যে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্টিফিকেটটা তার নিজের কবরের এপিটাফ ছিল, বাবা সেটাকেই তার সাফল্যের মুকুট হিসেবে প্রচার করছেন।
তার মা আলমারি থেকে আকাশের সেই নীল রঙের পুরনো ফাইলটা বের করলেন।
যেখানে তার ভার্সিটির সব সার্টিফিকেট সাজানো। ফাইলে হাত দিতেই ভেতর থেকে একটা হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
আকাশ নিচু হয়ে কাগজটা তুলল। ওটা সার্টিফিকেট নয়, ১০ বছর আগের সেই ড্রয়িং খাতার একটা ছেঁড়া পাতা। একটা অসমাপ্ত মুখচ্ছবি।
মা পাশ থেকে বললেন, “আকাশ, এই জঞ্জালগুলো এখনো রেখেছিস? বিয়ের আগে ঘরটা পরিষ্কার কর। অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলিস।”
আকাশ জানালার দিকে তাকাল। বাইরে আকাশটা আজ মেঘলা, ঠিক ১০ বছর আগের সেই ডাইনিং টেবিলের রাতের মতো।
সে বুঝতে পারল, এই 'অদৃশ্য ঘাতক' কেবল তার বাবাই নন, বরং এই সমাজ আর ব্যবস্থা যারা তিলে তিলে মানুষকে জীবিত লাশ বানিয়ে দেয়।
রাতে আকাশ তার ল্যাপটপটা খুলল। অনেকদিন পর সে একটা মেইল টাইপ করতে শুরু করল। মেইলটা কোনো কোম্পানির অর্ডারের জন্য নয়, বরং সেই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজকদের উদ্দেশ্যে।
আকাশ বিড়বিড় করে বলল, “সব খুনির বিচার হয় না, কিন্তু সব মৃতদেহ সবসময় কবরে শান্তিতে থাকে না। মাঝেমধ্যে তারা জেগে ওঠে।”
পরদিন সকালে মানিক সাহেব দেখলেন আকাশের ঘরের দরজা খোলা। ড্রয়িং টেবিলের ওপর আকাশের সেই দামি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিটা পড়ে আছে।
তবে সেটার ওপর লাল কালি দিয়ে একটা বড় ক্রস চিহ্ন আঁকা। আর নিচে ছোট করে লেখা “মৃতদেহটি এবার নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
বাসায় হুলুস্থুল পড়ে গেল।
কিন্তু পাশের বাসার সেই আত্মঘাতী শাকিলের মতো আকাশ কোনো ছাদ থেকে লাফ দেয়নি।
সে কেবল তার অদৃশ্য ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে নিজের পরিচয়টাকেই বদলে ফেলার যুদ্ধে নেমেছে।
মানিক সাহেব সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। তার সামনে পড়ে আছে সেই লাল কালি দিয়ে ক্রস করা সার্টিফিকেট।
আত্মীয়-স্বজনরা যারা কাল মিষ্টি খেয়েছিল, আজ তারা ফিসফিস করছে
তাদের চোখেমুখে একটা করুণার ছাপ, যেন আকাশ পাগল হয়ে গেছে।
মা ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “ছেলেটা কি তবে শাকিলের পথেই গেল? ও কি তবে?...”
মানিক সাহেব গর্জে উঠলেন, “না! ও কাপুরুষ নয়। ও স্রেফ আমার মুখে চুনকালি মাখিয়ে পালিয়েছে। ও জানে না এই দুনিয়ায় শুধু স্বপ্ন দিয়ে পেট ভরে না।”
এদিকে আকাশ তখন শহর থেকে অনেকটা দূরে এক জনশূন্য স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায়। তার কাঁধে একটা সাধারণ ব্যাগ, যাতে কয়েকটা কাপড় আর সেই পুরনো ড্রয়িং খাতাটা।
আজ ১০ বছর পর সে নিজেকে খুব হালকা অনুভব করছে। যে এসআর (SR) এর ব্যাগটা তাকে প্রতিদিন কুঁজো করে রাখত, সেটা সে স্টেশনের ডাস্টবিনেই ফেলে এসেছে।
ট্রেন চলল এক অজানা গন্তব্যের দিকে। জানালার বাইরে ছুটে চলা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আকাশ ভাবছিল সে কি আসলে পালাচ্ছে?
নাকি ১০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ১৫ বছরের কিশোর আকাশকে খুঁজে আনতে যাচ্ছে?
সপ্তাহখানেক পর।
আকাশ এখন পাহাড়ের পাদদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। এক বৃদ্ধ শিল্পী, যাকে লোকে 'পাগলা দাদু' বলে ডাকে, তার স্টুডিওতে আকাশ কাজ নিয়েছে।
কাজ বলতে ক্যানভাস পরিষ্কার করা আর রঙ গুলে দেওয়া। বিনিময়ে একবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই।
বৃদ্ধ একদিন কাজ করতে করতে বললেন, “তোমার টানে কোনো জীবন নেই আকাশ। তুমি তো দেখি শুধু ছবি আঁকো না, তুমি তোমার ভেতরের মৃত আত্মাকে ক্যানভাসে কবর দিচ্ছো।”
আকাশ চমকে উঠল। এই বৃদ্ধ কি তবে তার মনের 'অদৃশ্য ঘাতক'কে চিনে ফেলেছেন?
আকাশ ভাঙা গলায় বলল, “আমি তো এটাই চেয়েছিলাম দাদু।
আমার স্বপ্নগুলো যখন ডাইনিং টেবিলে খুন হয়েছিল, তখন থেকেই আমি মৃত।”
বৃদ্ধ হাসলেন। ব্রাশটা আকাশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “সব খুনেরই প্রমাণ থাকে।
তোমার খুনের প্রমাণ হলো তোমার এই জেদ। ওই ক্ষোভটাকে রঙে রূপান্তর করো। কবরের ওপর এপিটাফ নয়, বরং পাথরের বুক চিরে একটা গাছ জন্মানোর ছবি আঁকো।”
মাস তিনেক পরের দৃশ্য।
মানিক সাহেবের মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে একটা ছবি এল। কোনো টেক্সট নেই, শুধু একটা ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা ভাঙা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রাফটিং টেবিল, যার ফাটল দিয়ে একটা উজ্জ্বল লাল গোলাপ ফুটে বের হচ্ছে।
ছবির নিচে স্বাক্ষর করা "আকাশ: যে আবার জন্মেছে।"
মানিক সাহেব ছবিটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখে কি জল?
নাকি হার মেনে নেওয়ার গ্লানি? তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ছেলের স্বপ্নকে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আকাশের ভেতরের সেই শিল্পীকে তিনি ডাস্টবিনে জায়গা দিতে পারেননি।
সে সেখান থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে।
শেষে ষদেখা যায়, আকাশ পাহাড়ি উপত্যকায় বসে সূর্যাস্তের ছবি আঁকছে। তার কাঁধের ব্যাগটা এখন রঙে মাখামাখি।
তার পঁচিশতম জন্মদিনে সে নিজেকে মৃত ভেবেছিল, কিন্তু আজ ছাব্বিশের ভোরে সে প্রথমবার নিজেকে জীবিত আবিষ্কার করল।
অদৃশ্য ঘাতক আজও সমাজে ঘুরে বেড়ায়। কখনো মা-বাবার প্রত্যাশা হয়ে, কখনো পাশের বাসার মানুষের কানাঘুষা হয়ে।
তবে আকাশরা এখন আর ছাদ থেকে লাফ দেয় না; তারা এখন নিজেদের মতো করে বেঁচে ওঠার সাহস রাখে।
সমাপ্ত
এসআর (SR) এর চাকরিটা আকাশের জন্য কেবল জীবিকা নয়, বরং এক অদ্ভুত দণ্ড। প্রতিদিন রোদে পুড়ে দোকানে দোকানে গিয়ে যখন সে পণ্যের অর্ডার নেয়, তখন তার কানে সেই ড্রয়িং রুমের হাসাহাসি আর আত্মীয়দের বাঁকা কথাগুলো প্রতিধ্বনি হয়ে বাজে।
তার ব্যাগে থাকা ইনভয়েস প্যাডের ভাঁজে সে মাঝে মাঝে পেন্সিল দিয়ে ছোট ছোট স্কেচ আঁকে হয়তো কোনো জ্যামিতিক নকশা কিংবা কোনো বিধ্বস্ত মানুষের মুখ।
এক বিকেলে বৃষ্টির কারণে আকাশ একটা পুরনো লাইব্রেরির বারান্দায় আশ্রয় নিল। ভেতর থেকে আসা পুরনো কাগজের গন্ধটা তাকে মুহূর্তেই সেই ১০ বছর আগের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। ঠিক তখনই পাশের দেয়ালে সাঁটানো একটা পোস্টারে তার চোখ আটকে গেল।
সেখানে লেখা রয়েছে "জাতীয় চিত্র প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা।"
আকাশের হাতটা অজান্তেই পকেটে থাকা কলমটার দিকে গেল।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল মানিক সাহেবের সেই শান্ত গলা, “যা করার আজকে করে নে।” আজ ১০ বছর পর সেই আদেশটা যেন তার মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বইয়ে দিল।
বাসায় ফিরতেই দেখল ড্রয়িং রুমে আবার জটলা। এবার আলোচনার বিষয় আকাশের বিয়ে।
পাত্রীপক্ষ বেশ অবস্থাপন্ন।
মানিক সাহেব গর্বিত মুখে বলছেন, “আমার ছেলে তো ইঞ্জিনিয়ার, এখন নামকরা কোম্পানিতে বড় পোস্টে আছে। ক্যারিয়ার খুব উজ্জ্বল!”
আকাশ তার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাসল। যে ইঞ্জিনিয়ারিং সার্টিফিকেটটা তার নিজের কবরের এপিটাফ ছিল, বাবা সেটাকেই তার সাফল্যের মুকুট হিসেবে প্রচার করছেন।
তার মা আলমারি থেকে আকাশের সেই নীল রঙের পুরনো ফাইলটা বের করলেন।
যেখানে তার ভার্সিটির সব সার্টিফিকেট সাজানো। ফাইলে হাত দিতেই ভেতর থেকে একটা হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
আকাশ নিচু হয়ে কাগজটা তুলল। ওটা সার্টিফিকেট নয়, ১০ বছর আগের সেই ড্রয়িং খাতার একটা ছেঁড়া পাতা। একটা অসমাপ্ত মুখচ্ছবি।
মা পাশ থেকে বললেন, “আকাশ, এই জঞ্জালগুলো এখনো রেখেছিস? বিয়ের আগে ঘরটা পরিষ্কার কর। অপ্রয়োজনীয় কাগজ পুড়িয়ে ফেলিস।”
আকাশ জানালার দিকে তাকাল। বাইরে আকাশটা আজ মেঘলা, ঠিক ১০ বছর আগের সেই ডাইনিং টেবিলের রাতের মতো।
সে বুঝতে পারল, এই 'অদৃশ্য ঘাতক' কেবল তার বাবাই নন, বরং এই সমাজ আর ব্যবস্থা যারা তিলে তিলে মানুষকে জীবিত লাশ বানিয়ে দেয়।
রাতে আকাশ তার ল্যাপটপটা খুলল। অনেকদিন পর সে একটা মেইল টাইপ করতে শুরু করল। মেইলটা কোনো কোম্পানির অর্ডারের জন্য নয়, বরং সেই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজকদের উদ্দেশ্যে।
আকাশ বিড়বিড় করে বলল, “সব খুনির বিচার হয় না, কিন্তু সব মৃতদেহ সবসময় কবরে শান্তিতে থাকে না। মাঝেমধ্যে তারা জেগে ওঠে।”
পরদিন সকালে মানিক সাহেব দেখলেন আকাশের ঘরের দরজা খোলা। ড্রয়িং টেবিলের ওপর আকাশের সেই দামি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিটা পড়ে আছে।
তবে সেটার ওপর লাল কালি দিয়ে একটা বড় ক্রস চিহ্ন আঁকা। আর নিচে ছোট করে লেখা “মৃতদেহটি এবার নিখোঁজ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”
বাসায় হুলুস্থুল পড়ে গেল।
কিন্তু পাশের বাসার সেই আত্মঘাতী শাকিলের মতো আকাশ কোনো ছাদ থেকে লাফ দেয়নি।
সে কেবল তার অদৃশ্য ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে নিজের পরিচয়টাকেই বদলে ফেলার যুদ্ধে নেমেছে।
মানিক সাহেব সোফায় স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। তার সামনে পড়ে আছে সেই লাল কালি দিয়ে ক্রস করা সার্টিফিকেট।
আত্মীয়-স্বজনরা যারা কাল মিষ্টি খেয়েছিল, আজ তারা ফিসফিস করছে
তাদের চোখেমুখে একটা করুণার ছাপ, যেন আকাশ পাগল হয়ে গেছে।
মা ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, “ছেলেটা কি তবে শাকিলের পথেই গেল? ও কি তবে?...”
মানিক সাহেব গর্জে উঠলেন, “না! ও কাপুরুষ নয়। ও স্রেফ আমার মুখে চুনকালি মাখিয়ে পালিয়েছে। ও জানে না এই দুনিয়ায় শুধু স্বপ্ন দিয়ে পেট ভরে না।”
এদিকে আকাশ তখন শহর থেকে অনেকটা দূরে এক জনশূন্য স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায়। তার কাঁধে একটা সাধারণ ব্যাগ, যাতে কয়েকটা কাপড় আর সেই পুরনো ড্রয়িং খাতাটা।
আজ ১০ বছর পর সে নিজেকে খুব হালকা অনুভব করছে। যে এসআর (SR) এর ব্যাগটা তাকে প্রতিদিন কুঁজো করে রাখত, সেটা সে স্টেশনের ডাস্টবিনেই ফেলে এসেছে।
ট্রেন চলল এক অজানা গন্তব্যের দিকে। জানালার বাইরে ছুটে চলা গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আকাশ ভাবছিল সে কি আসলে পালাচ্ছে?
নাকি ১০ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই ১৫ বছরের কিশোর আকাশকে খুঁজে আনতে যাচ্ছে?
সপ্তাহখানেক পর।
আকাশ এখন পাহাড়ের পাদদেশের এক ছোট্ট গ্রামে। এক বৃদ্ধ শিল্পী, যাকে লোকে 'পাগলা দাদু' বলে ডাকে, তার স্টুডিওতে আকাশ কাজ নিয়েছে।
কাজ বলতে ক্যানভাস পরিষ্কার করা আর রঙ গুলে দেওয়া। বিনিময়ে একবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার ঠাঁই।
বৃদ্ধ একদিন কাজ করতে করতে বললেন, “তোমার টানে কোনো জীবন নেই আকাশ। তুমি তো দেখি শুধু ছবি আঁকো না, তুমি তোমার ভেতরের মৃত আত্মাকে ক্যানভাসে কবর দিচ্ছো।”
আকাশ চমকে উঠল। এই বৃদ্ধ কি তবে তার মনের 'অদৃশ্য ঘাতক'কে চিনে ফেলেছেন?
আকাশ ভাঙা গলায় বলল, “আমি তো এটাই চেয়েছিলাম দাদু।
আমার স্বপ্নগুলো যখন ডাইনিং টেবিলে খুন হয়েছিল, তখন থেকেই আমি মৃত।”
বৃদ্ধ হাসলেন। ব্রাশটা আকাশের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “সব খুনেরই প্রমাণ থাকে।
তোমার খুনের প্রমাণ হলো তোমার এই জেদ। ওই ক্ষোভটাকে রঙে রূপান্তর করো। কবরের ওপর এপিটাফ নয়, বরং পাথরের বুক চিরে একটা গাছ জন্মানোর ছবি আঁকো।”
মাস তিনেক পরের দৃশ্য।
মানিক সাহেবের মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে একটা ছবি এল। কোনো টেক্সট নেই, শুধু একটা ছবি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটা ভাঙা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রাফটিং টেবিল, যার ফাটল দিয়ে একটা উজ্জ্বল লাল গোলাপ ফুটে বের হচ্ছে।
ছবির নিচে স্বাক্ষর করা "আকাশ: যে আবার জন্মেছে।"
মানিক সাহেব ছবিটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখে কি জল?
নাকি হার মেনে নেওয়ার গ্লানি? তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি ছেলের স্বপ্নকে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে বলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আকাশের ভেতরের সেই শিল্পীকে তিনি ডাস্টবিনে জায়গা দিতে পারেননি।
সে সেখান থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে।
শেষে ষদেখা যায়, আকাশ পাহাড়ি উপত্যকায় বসে সূর্যাস্তের ছবি আঁকছে। তার কাঁধের ব্যাগটা এখন রঙে মাখামাখি।
তার পঁচিশতম জন্মদিনে সে নিজেকে মৃত ভেবেছিল, কিন্তু আজ ছাব্বিশের ভোরে সে প্রথমবার নিজেকে জীবিত আবিষ্কার করল।
অদৃশ্য ঘাতক আজও সমাজে ঘুরে বেড়ায়। কখনো মা-বাবার প্রত্যাশা হয়ে, কখনো পাশের বাসার মানুষের কানাঘুষা হয়ে।
তবে আকাশরা এখন আর ছাদ থেকে লাফ দেয় না; তারা এখন নিজেদের মতো করে বেঁচে ওঠার সাহস রাখে।
সমাপ্ত

No comments