নিঃসন্তান সংসার

লেখক: ওয়াজাদ আহমেদ
”ঘরের জানালাটা অর্ধেক খোলা। বাইরে পাখির ডাক। ভোরের আলো এসে বিছানার এক কোণ ছুঁয়ে যাচ্ছে।

সাবিনার তখনও পুরোপুরি ঘুম ভাঙেনি। মাথার পাশে শাড়ির আঁচল এলোমেলো হয়ে আছে।

পাশে বসে আরাফ চুপচাপ তাকে দেখছে। আরাফ হালকা হেসে বলল, “ঘুমের মাঝে তোমার মুখের মায়ায়,
মন হারাই আমি স্বপ্নের ছায়ায়।”

সাবিনা চোখ মেলে তাকাল। একটু লজ্জা, একটু অচেনা ভাব। দুজনেই হেসে ফেলল।

বিয়ের প্রথম কয়েকটা দিন এমনই কেটে গেল ছোট ছোট কথায়।

অকারণ হাসিতে, নতুন জীবনের অদ্ভুত মিষ্টি অস্বস্তিতে।

দুই মাস পর

বিকেলের সময়।

ডাইনিং টেবিলে বসে আছে আরাফের মা। সামনে চা, পাশে বিস্কুট।

শাশুড়ি চোখ কুঁচকে বললেন, “এই সাবিনা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? কিছু বুঝছো না এখনো?”

সাবিনা কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে থাকে।

শাশুড়ি হালকা বিরক্ত হয়ে বললেন, “মানে দুই মাস হয়ে গেল। কোনো খবর নেই যে?”

সাবিনা বলল, “আম্মা, এত তাড়াতাড়ি কি?” শাশুড়ি তার কথা কেটে দিয়ে বললেন, “তাড়াতাড়ি মানে?
আরে আমাদের সময়ে তো এক মাসেই খবর চলে আসতো!” ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

আরাফ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল।

সে একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “মা, এত প্রেসার দেওয়ার দরকার নেই।
সবকিছুর একটা সময় আছে।”

শাশুড়ি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বললেন, “তুই চুপ কর। সংসারের কিছু কিছু ব্যাপার মেয়েরকেই বুঝতে হয়।”

সাবিনা মাথা নিচু করে বসে রইল। তার মনে হঠাৎ এক অজানা ভয় ঢুকে গেল। যেন সামনে ভয়ঙ্কর কিছু
অপেক্ষা করছে।

সেদিন রাতে ঘরটা নিঃশব্দ।

সাবিনা আরাফকে বলল, “শুনো, যদি কখনো আমাদের সন্তান না হয়?”

আরাফ একটু থেমে গেল।

তারপর ধীরে হেসে বলল, “সবাই কি বাবা-মা হয়?”

সাবিনা বলল, “কিন্তু সমাজ তো!”

আরাফ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তো সমাজকে বিয়ে করিনি, তোমাকে করেছি সাবিনা।”

সাবিনার চোখ ভিজে উঠল। কিন্তু সে জানে না এই কথাগুলো কতদিন সত্যি থাকবে।

শীতের সকাল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে সাবিনা কাপড় মেলছে। হাত ঠান্ডায় কাঁপছে, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতাটা ঠান্ডার জন্য না।

পেছন থেকে শাশুড়ির কণ্ঠ ভেসে এলো, “এইভাবে আর কতদিন চলবে?
লোকজন জিজ্ঞেস করতে শুরু করেছে।
কী বলবো আমি?”

সাবিনা বলল, “মা। আপনি কি বলছে আমি বুঝতে পারছি না।”

শাশুড়ি বললেন, “বুঝতে পারছ না মানে? নাকি কিছু লুকাচ্ছ?” এই কথাটায় সাবিনার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

সেদিন দুপুরে আরাফ office থেকে একটু আগেই ফিরে আসে।

সাবিনা চোখে জল নিয়ে বলল, “আমরা কি ডাক্তার দেখাবো?
আমি না, সবাই চিন্তা করছে।”

দুই দিন পর তারা শহরের এক ক্লিনিকে যায়।

ডাক্তারের কক্ষে ঢোকার আগে সাবিনা ফিসফিস করে বলল,
“যদি কিছু খারাপ হয়?”

আরাফ হাত শক্ত করে ধরে বলল, “আমরা একসাথে আছি, এটাই যথেষ্ট।”

ডাক্তারের রুমে মাঝবয়সী এক ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন, “কতদিন হলো বিয়ে?”

আরাফ জানালো, “প্রায় ছয় মাস।”

ডাক্তার বললেন, “ঠিক আছে। কিছু টেস্ট করতে হবে দুজনেরই।”

সাবিনা চমকে উঠে বলল, “দুজনের?”

ডাক্তার স্বাভাবিকভাবে বললেন, “অবশ্যই। সন্তান না হওয়া শুধু মেয়েদের সমস্যা এই ধারণাটা ভুল।”

রিপোর্ট আসার দিন।

আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন। ডাক্তার রিপোর্টটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এই নীরবতাটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।

ডাক্তার ধীরে বললেন, “দেখুন, একটা বিষয় পরিষ্কার। সমস্যাটা একটু জটিল। মিসেস সাবিনার ক্ষেত্রে গর্ভধারণের
সম্ভাবনা খুবই কম।”

মুহূর্তটা যেন থেমে গেল। সাবিনা আস্তে করে আরাফের হাত ছাড়িয়ে নিল। মনে হলো এই হাতটা ধরে রাখার
অধিকার তার আর নেই। ক্লিনিক থেকে বের হওয়ার পর তাদের দুজনের মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল।

সাবিনা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কিছু বলছ না কেন?”

আরাফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “কি বলবো?”

এই ছোট্ট কথাটাই সাবিনার হৃদয়ে ছুরি হয়ে বিঁধে গেল। এখানেই শুরু হলো ভাঙনের প্রথম রেখা।

বিকেলের আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে।

শাশুড়ি অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হলো? চুপ করে আছো কেন?”

আরাফ শুষ্ক গলায় বলল, “ডাক্তার বলেছে সমস্যা আছে। সাবিনার।”

শব্দটা উচ্চারণ হওয়ার সাথে সাথে সবকিছু বদলে গেল।

শাশুড়ি তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, “আমি তো আগেই বুঝছিলাম। আমাদের বংশে এমন কখনো হয়নি।”

সেদিন রাতে ঘরের বাতিটা নিভানো।

সাবিনা ভাঙা গলায় বলল, “তুমিও কি আমাকে দোষ দিচ্ছ? তুমি তো বলেছিলে আমি মানুষ, শুধু মা না।”

আরাফ চুপ করে রইল।

এই চুপ থাকাটাই উত্তর হয়ে গেল। পরের কয়েকটা দিন ঘরের ভেতর আচরণ বদলে যেতে শুরু করল।

শাশুড়ির মুখে সারাক্ষণ গঞ্জনা, “এতদিন আমাদের সাথে প্রতারণা করলে? বিয়ের আগে বলোনি কেন?”

একদিন দুপুরে খাবার টেবিলে হঠাৎ শাশুড়ি বলে উঠলেন, “আরাফ, তোমার আবার বিয়ে করা উচিত। একটা সংসার
বাচ্চা ছাড়া চলে না।” সাবিনার হাত থেকে চামচটা পড়ে গেল।

সে আরাফের দিকে তাকাল শেষ আশ্রয়ের মতো, “তুমি কিছু বলবে না?” আরাফ মাথা নিচু করে থাকল।

তার এই নীরবতা সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হয়ে গেল।

সাবিনা এখন কম কথা বলে। একদিন বিকেলে আরাফ অফিস থেকে ফিরে দেখে টেবিলের উপর একটা কাগজ।

সাবিনা লিখেছে, “আমি একটু বাবার বাড়ি যাচ্ছি। কিছুদিন নিজের মতো থাকতে চাই।”

সাবিনা বাবার বাড়িতে তার মাকে জিজ্ঞেস করল, “মা, আমি যদি মা হতে না পারি, তাহলে কি আমি খারাপ?”

মা চোখ মুছে বললেন, “মানুষ হওয়াটাই বড় কথা, মা হওয়া না।”

এদিকে আরাফের ঘরে শাশুড়ি রাগে ফুঁসছেন, “দেখেছো? মেয়েটা কেমন!
নিজের দোষ ঢাকতে বাপের বাড়ি চলে গেছে!”

কয়েকদিন পর আরাফ আবার একা ডাক্তারের কাছে গেল। ডাক্তার ফাইলটা বের করে সামনে রেখে ভ্রু কুঁচকে
বললেন, “আপনারা কি সব রিপোর্ট ঠিকমতো দেখেছিলেন?”

আরাফ অবাক হয়ে তাকাল। ডাক্তার একটা পৃষ্ঠা সামনে এগিয়ে দিয়ে শান্তভাবে বললেন, “সমস্যাটা মূলত আপনার
দিকেই। মেল ফ্যাক্টর ইনফার্টিলিটি।” ঘরটা যেন ঘুরতে শুরু করল।

আরাফের মনে একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে উঠল। সে বুঝতে পারল, যে ভুলের বোঝা সে সাবিনার ওপর চাপিয়ে
দিয়েছিল। প্রকৃত দায়ী সে নিজেই। ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আরাফ অনেকক্ষণ হাসপাতালের
করিডোরে বসে রইল। তার হাতে থাকা রিপোর্টটা যেন হাজার মণ ভারী মনে হচ্ছে। যে মানুষটাকে সে দিনের পর
দিন অপরাধবোধের সাগরে ডুবিয়েছে, যার সম্মান নিয়ে তার মা প্রতিনিয়ত টানাটানি করেছে, সেই সাবিনাই ছিল
নিরপরাধ। অথচ সে নিজে সত্যটা জানার চেষ্টা না করেই মৌন থেকে সব মেনে নিয়েছিল।

বাড়ি ফেরার পর আরাফ ঘরে ঢোকা মাত্রই তার মা এগিয়ে এলেন।

মা হাসি হাসি মুখে বললেন, "কিরে, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলি? নতুন বিয়ের কথাবার্তা কিছু আগাবো? ওই অলক্ষ্মী
দুর হয়েছে। এবার একটা লক্ষ্মী মেয়ে ঘরে তুলি।"

আরাফ শান্ত গলায় বলল, "মা, এই রিপোর্টটা দেখো।" মা রিপোর্ট হাতে নিয়ে কিছুই বুঝতে পারলেন না।

আরাফ ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে বলল, "ডাক্তার বলেছে সমস্যা সাবিনার নয়, সমস্যা আমার।
সাবিনা সুস্থ, আমিই কোনোদিন বাবা হতে পারব না।"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল। তার মায়ের হাত থেকে রিপোর্টের কাগজটা মেঝেতে পড়ে গেল।

তিনি তোতলাতে তোতলাতে বললেন, "এ... এসব কী বলছিস? ডাক্তার নিশ্চয়ই ভুল বলছে!
আমাদের বংশে তো এমন কোনোদিন..."

আরাফ চিৎকার করে উঠল, "বংশ! বংশ! বংশ! গজব পড়ুক তোমার এই বংশে। শুধু এই বংশের দোহাই দিয়ে তুমি
একটা মেয়েকে জ্যান্ত কবর দিয়েছ। অথচ দোষটা ছিল আমার!" সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে নিল।

মা বাধা দিতে এলে সে শুধু বলল, "সাবিনাকে ফিরিয়ে আনতে যাচ্ছি মা। যদি সে আমায় ক্ষমা করে, তবেই এ বাড়িতে
আমরা ফিরব। আর যদি না ফেরে, তবে বুঝে নিও আমি আমার পাপের সাজা পাচ্ছি।"

সাবিনার বাবার বাড়ি

সাবিনা তখন বারান্দায় বসে সূর্যাস্ত দেখছিল। তার চোখে এখন আর জল নেই, আছে এক গভীর
শূন্যতা। হঠাৎ গেটের সামনে গাড়ি থামার শব্দ হলো। দেখল আরাফ দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা বিধ্বস্ত।

আরাফ ভেতরে এসে সাবিনার সামনে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে
সাবিনার সামনে বসে পড়ল। সাবিনার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

ভাঙা গলায় বলল, "সাবিনা, আমাকে ক্ষমা করো। অপরাধী তুমি নও, অপরাধী আমি। রিপোর্ট ভুল ছিল না, আমিই
দেখতে ভুল করেছিলাম... অথবা হয়তো সমাজ আর বংশের দম্ভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।"

সাবিনা হাতটা ছাড়িয়ে নিল না। সে ধীরস্থিরভাবে আরাফের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি যখন জানতে সমস্যা আমার,
তখন তো আমায় ছেড়ে দিতে চেয়েছিলে। এখন যখন জানলে সমস্যা তোমার, তখন আমার কাছে ফিরে এলে কেন?
আমি তো সেই সাবিনাই আছি।"

আরাফ ডুকরে কেঁদে উঠল, "আমি তোমার যোগ্য নই সাবিনা। কিন্তু তোমাকে ছাড়া আমি একা হয়ে গেছি। তুমি
বলেছিলে না তুমি সমাজকে নয়, আমাকে বিয়ে করেছ? আজ আমি বলছি, আমি কোনো সন্তানকে নয়, শুধু
তোমাকেই চাই। আমাকে একটা সুযোগ দাও সবটা সংশোধন করার।"

সাবিনা জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। সে জানে, এই ক্ষত সহজে শুকোবে না। সমাজের কটু কথা আর
শাশুড়ির অবজ্ঞা হয়তো আবার ফিরে আসবে। কিন্তু আরাফের চোখের ওই জলটুকুতে সে অন্তত নিজের হারানো
সম্মানটা খুঁজে পেল। সে দিন সন্ধ্যায় সাবিনা আরাফের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। সে ফিরবে, কিন্তু আগের মতো দুর্বল
হয়ে নয়। সে জানে, সংসার মানে কেবল সন্তান উৎপাদন নয়; বরং প্রতিকূল সময়ে একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রাখা।

সমাপ্ত

ليست هناك تعليقات

يتم التشغيل بواسطة Blogger.