অদৃশ্য ঘাতক পর্ব ১
লেখকঃ ওয়াজাদ আহমেদ
মানিক সাহেবের ঘরে আজ খুশির ধুম পড়েছে।
আজ তার ঘর আলো করে একটা পুত্র সন্তান আগমন করেছে।
সারা পাড়ায় মিষ্টি বিতরণ চলছে।
আর চলবে নাই বা কেন? আরে পুত্র সন্তান হয়েছে। বাবার বোঝা হালকা করবে।
বাচ্চাকে কোলে নিয়েই মানিক সাহেব বললেন, “এর নাম দিলাম আকাশ। আমার মিষ্টি ছেলে! বড় হয় তুই ইঞ্জিনিয়ার হবি। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করবি।”
আজ থেকেই কিছু একটা শুরু হয়েছে। যে এইমাত্র মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হলো, তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে আকাশ সমান বোঝা।
এ তো আর যে সে বোঝা নয়। বরং এক মস্ত বড় মানসিক বোঝা।
যে বাচ্চাটা এখন পৃথিবী সম্পর্কে একেবারেই গাফেল। তার অজান্তেই তার ঘাড়ে এত বড় একটা চাপ চলে এলো।
দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। তাদের ছেলে একটু বড় হয়েছে। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হলো। স্কুলে পড়ার চাপ তো থাকেই। সাথে সাথে বাড়িতেও স্বস্তি নেই। বাড়ি এলেই পড়তে বসতে হয়। না হয়ে বাবা মায়ের বকা ঝকা তো আছেই।
জীবনের এসব ঝর ঝাপটা বহন করতে করতে আকাশ যখন ক্লাস নাইনে উঠলো, তখন এক রকম জোরজবস্তি করেই তার বাবা তাকে সাইন্স নিতে বাধ্য করল।
কিন্তু তার বিজ্ঞানের প্রতি একদম আগ্রহ নেই। তার আগ্রহ শিল্পে। সে আঁকতে ভালোবাসে। আহা! কতই না সুন্দর তার আঁকা ছবিগুলো? বন্ধুরা খুব প্রশংসা করে।
এমনকি তাকে একজন চিত্রশিল্পী হওয়ার জন্য উৎসাহ দেয়।
পাহাড়, পর্বত, বন-জঙ্গল, গাছ-গাছালি পাখ-পাখালি ইত্যাদি আঁকতে সে খুব ভালোবাসে।
তার আকার হাতও দারুন। তার অঙ্কন দেখে মনে হবে যেন কোন প্রফেশনাল শিল্পী এঁকেছে।
টিফিনে যখন সবাই খাওয়া দাওয়া ও গল্প গুজবে ব্যস্ত থাকতো, আকাশ তখন স্কুলের বারান্দার এক কোনায় বসে থাকতো। বসে বসে ভাবতো, “সবার বাবা-মা ই কি একরকম হয়? নাকি শুধু আমার ভাগ্যটাই খারাপ?”
এসব ভাবতে ভাবতে তার বন্ধু সজীবের আগমন ঘটলো।
আকাশের ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল, “কিরে! কি ভাবছিস বলতো? এভাবে একা একা বসে থাকতে ভালো লাগে? চল! ওদিকটায় চল! খেলা করি গিয়ে!”
উল্লেখ্য যে সজীব ক্লাসের টপার। দেখতে দারুণ আর স্মার্ট লুকের অধিকারী। ক্লাসের প্রায় সবাই তার মত হতে চায়।
দেখতে দেখতেই সে হাই স্কুল পার হলো।
বাবার জোরাজুরিতে আবারো সাইন্স নিতে হলো।
একদিন কলেজে যাওয়ার সময়।
আকাশ বাড়ির গেট খুলে কলেজের উদ্যেশ্য রওনা হবে ঠিক তখনই পাশের বাড়ির এক সিনিয়র ভাই শাকিল তার সামনে পড়লো।
আকাশ সম্মানের সাথে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন?
শাকিল ভাই তাকে দেখে বললেন, “হ্যাঁ ভাই। চলছে কোন রকম।”
শাকিল ভাইয়ের চোখেমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট।
আকাশ প্রশ্ন ভরা মুখ নিয়ে বলল,
“কি হলো ভাইয়া। চিন্তিত মনে হচ্ছে। কোন সমস্যা আছে?”
শাকিল ভাই উত্তর দিলেন, “বুঝবে ভাই। তুমি একদিন বুঝবে। তুমিও আমার মত একই পথে হাঁটছো। বাবা-মার ইচ্ছা মতো সাবজেক্ট নিয়ে এত বছর পড়াশোনা করলাম। আর এখন চাকরি পাচ্ছি না।
তারা এখন আমাকে কথা শোনাচ্ছে। মাঝে মাঝে তো মনে হয় সব শেষ করে...। (হঠাৎ থেমে গিয়ে) না কিছু না”
আকাশ বলল,
“সেটা তো জানি ভাইয়া। কিন্তু আমি কি করতে পারি বলুন? বাবা মায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে তো কিছু করা সম্ভব নয়। “
শাকিল ভাই বললেন,
“জীবনটা ছেলে খেলা নয় ভাই। মনে রাখবে, বাবা মা কিন্তু চিরদিন তোমার সঙ্গে থাকবে না। যখন তারা গত হবেন তখন কিন্তু তোমার নিজের উপরে আফসোস হবে। আর আমার অবস্থা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যে চাকরির অফারগুলো পাচ্ছি, সেগুলোর জন্য এত পড়াশোনা করার কোন প্রয়োজনই ছিল না।
তারপর শাকিল ভাই আকাশের কাঁধে হাত দিয়ে বললেন,
“সে যাই হোক! ভালো থাকো ছোট ভাই”
কলেজে।
আকাশ প্রথম পিরিয়ড শেষ করে ক্যাম্পাসে বসে আছে।
কিছু একটা ভাবছে, “জীবনটা কি এভাবেই কেটে যাবে? কখনো কি শান্তির মুখ দেখবো না?”
তখনই রিয়া এসে উপস্থিত হয়ে বলল,
“আমি সাহায্য করতে পারি।”
আকাশ অবাক হয়ে বলল,
“মানে? কি বলতে চাস তুই?”
রিয়া হেসে বলল,
“আরে ওই যে, কমার্স বিভাগে একটা নতুন মেয়ে ভর্তি হয়েছে। ওর নামই তো শান্তি হি হি হি।”
আকাশ রেগে গিয়ে বলল,
“দেখ এখন আমার মুড ভালো নেই। মশকরা করতে ভালো লাগছে না।”
রিয়া আবার বললো,
“তোর মুড কখনই বা ভালো থাকে? সারাদিন তো গোমরা মুখ করে থাকিস।”
আকাশ বলল,
“এই তুই যাবি এখান থেকে?
রিয়া বলল,
“আরে এসব ছাড়। ফুচকা অর্ডার করেছি। খাবি চল।”
আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল,
“আরে যা তো। এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।”
এর জবাবে রিয়া বলল,
“ঠিক আছে! তাহলে বিলটা কিন্তু তুই দিবি।!”
আকাশ বলল,
“ঠিক আছে দিয়ে দেবো। এবার যা তো সামনে থেকে।”
কলেজ শেষ করে আকাশ বাড়ি ফিরল।
মা তাকে জিজ্ঞাসা করল,
“কিরে কলেজ কেমন কাটলো?”
আকাশ উত্তর দিল,
“যেমনটা সব সময় কাটে!”
মা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“কিরে বাবা মন খারাপ নাকি?”
আকাশ কিছু না বলে রুমে চলে গেল।
আকাশ কিছু না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। রাত সাড়ে আটটায় ঘুম ভাঙলো।
রাতের খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাওয়ার সময় দেখলো যে তার পাশের বাড়ি কিছু একটা হচ্ছে।
“আরে এটা তো শাকিল ভাইয়ার রুম।”
পর্দার আড়াল থেকে কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। সে নিজে জানার কাচ খুলে দেখার চেষ্টা করলো।
দেখল ঘরে আলো। আর উপর থেকে নিচে একটা দড়ির মতো মত কিছু একটা ঝুলছে। সে চোখ কচলে আবার তাকালো। কিন্তু এখন কিছু দেখতে পেল না।
সে মনের ভুল ভেবে ঘুমিয়ে পড়ল।
সে এখন স্বপ্নে বিভোর।
বই তাকে তাড়া করছে। সাথে বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজনরাও।
বাবা মা বলছে,
”ঐ দেখ! ওমুকের ছেলে এটা করেছ, ওমুকের ছেলে এটা করেছে।
সে কি করবে কিছু বুঝে ও পারছে না।
পেছন থেকে তার মা বলছে,
“আকাশ! এই আকাশ! ওঠ বাবা।”
আকাশ ভাবতে লাগলো,
“আরে কোথায় উঠব?”
হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল। তাও আবার মায়ের ডাকে।
মা বললেন,
“আরে তোকে কখন থেকে ডাকছি। উঠতে এত দেরি করলি কেন?”
আকাশ কিছুটা থতমত খেয়ে বলল,
“আমি…. আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। বলো মা ডাকলে কেন? তাও আবার এতো সকালে? কলেজের টাইম হতে এখনো চার ঘন্টা বাকি।”
মা হতাশ মুখ নিয়ে বললেন, “আরে পাশের বাসার শাকিল ছিল না? ও আত্মহত্যা করেছে।”
আকাশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।
তারমানে রাতে সে যেটা দেখেছে সেটা চোখের ভুল নয়? ওটা সত্য ছিল?
এটা খুবই খারাপ হয়েছে। একটা তরতাজা প্রাণ এভাবে ঝরে গেল?
যাহোক ইসলাম অনুসারে তার দাফন কাফন হলো।
বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে।
আকাশ ভালোভাবে পড়াশোনা করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু যে বিষয়ে আগ্রহ নেই সে বিষয়ে কোনো কাজ কি ভালোভাবে হতে পারে? তার সাথেও ঠিক তাই হল
দীর্ঘ ৬ বছর পরের দৃশ্য।
মানিক সাহেবের ড্রয়িং রুমে এখন উৎসবের আমেজ।
আত্মীয়-স্বজনে ঘর ভরা। সবার হাতে মিষ্টির প্যাকেট।
কারণ আকাশ একটা ফুড কোম্পানিতে SR হিসেবে জয়েন করেছে।
অথচ রুমের কোণায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা আকাশ ভাবছে, চার বছর ল্যাবে হাড়ভাঙা খাটুনি করে অর্জিত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বইগুলো দিয়ে এখন চমৎকার ঠোঙা বানানো যাবে।
তার মা হাসিমুখে সবাইকে বলছেন,
“ছেলে আমার অনেক বুদ্ধিমান!”
আকাশ শুধু ভাবছে, বুদ্ধিটা যদি থাকত তবে সে অনেক আগেই এই চোর-পুলিশ খেলা থেকে পালিয়ে যেত।
প্রতিবেশীরা মনে মনে ভাবছে,
“হ্যাঁ বুদ্ধি আছে বটে। এজন্যই SR এর চাকরি পেয়েছে।”
এইতো কয়েকদিন আগে আকাশের পঁচিশতম জন্মদিন গেল। অথচ তার মনে হচ্ছিল আজ তার দশম মৃত্যুবার্ষিকী।
ঠিক দশ বছর আগে।
যেদিন সে প্রথমবার ইঞ্জিনিয়ারিং এর বদলে ছবি আঁকার খাতাটা হাতে নিয়েছিল।
সেদিনই তার বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে প্রথম 'খুন'টা করেছিলেন। তবে এই খুন সেই খুন নয়। এতে না কোনো রক্ত ঝরে, না কোন চিৎকার হয়। না কোন মামলা হয়, না কোন বিচার পাওয়া যায়।
আজ সেই ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রির সার্টিফিকেটটা হাতে নিয়ে আকাশের মনে হচ্ছে, এটা কোনো খুশির খবর নয়, বরং তার নিজের কবরের এপিটাফ।”

ليست هناك تعليقات